$৭৫০ বিলিয়নের বাজি: ওপেনএআই কি সময়ের অভাবে ভুগছে?
আমরা প্রায় সবাই এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছি। একটা কাজ খুব উদ্দীপনা নিয়ে শুরু করলেন, মনে হলো সবাইকে অনেক পেছনে ফেলে এগিয়ে গিয়েছেন, আর তারপর... হঠাৎ দেখলেন সবাই কাছাকাছি চলে এসেছে, আর আপনার মাথার ওপর জমছে খরচের পাহাড়।
ওপেনএআই (OpenAI) এর অবস্থাটা ঠিক এখন এমনই।
২০২২ সালের কথা চিন্তা করুন—যখন চ্যাটজিপিটি (ChatGPT) প্রথম এলো, মনে হচ্ছিল সত্যি কোনো যাদুঘর খুলে গেছে। কিন্তু ২০২৬ সালের এই সময়ে এসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই বিশাল সাম্রাজ্যের নিচের মাটি কেঁপে উঠছে।
বর্তমানে যেসব আর্থিক হিসাব সামনে আসছে, তা মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো। ২০২৬ সালের প্রথম কোয়ার্টারে ওপেনএআই-এর আয় ছিল $৫.৭ বিলিয়ন ডলার, কিন্তু তাদের অপারেটিং লস বা পরিচালন ক্ষতি দাঁড়িয়েছে $৬.৯৫ বিলিয়ন ডলারে! অর্থাৎ, প্রতি $১ ডলার আয়ের বিপরীতে তাদের খরচ হচ্ছে $২ ডলারেরও বেশি। তাদের অপারেটিং মার্জিন নেমে এসেছে -১২২%-এ।
এমনকি স্যাম অল্টম্যান নিজেও স্বীকার করেছেন, "গত ১২ মাস আমাদের সেরা সময় ছিল না, আর এর বেশিরভাগ দায় আমারই।"
কিন্তু প্রশ্ন হলো—যে কোম্পানি এআই বিপ্লবের সূচনা করলো, তারা এত বড় আর্থিক চাপের মধ্যে কীভাবে পড়লো?
১. গ্রাহক সংখ্যার বিভ্রান্তি ও এন্টারপ্রাইজ বাজারের পতন
আপনি যদি শুধু ইউজার সংখ্যা দেখেন, তবে চ্যাটজিপিটিকে এখনো অপরাজেয় মনে হবে। সপ্তাহে প্রায় ৯০ কোটি (900 Million) মানুষ এটি ব্যবহার করেন। কিন্তু আসল সত্যিটা একটু অন্যরকম:
-
ফ্রি ইউজারের চাপ: এই ৯০ কোটি ইউজারের প্রায় ৯৫%-ই ফ্রি ভার্সন ব্যবহার করেন। তাদেরকে টাকা দিয়ে সাবস্ক্রিপশন নেওয়া গ্রাহকে রূপান্তর করা বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে।
-
মার্কেট শেয়ার হ্রাস: গ্লোবাল এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট বাজারে চ্যাটজিপিটির শেয়ার এই প্রথম ৫০%-এর নিচে (৪৬%) নেমে এসেছে। অন্যদিকে গুগলের ‘জেমিনি’ (Gemini) ২৮% এবং অ্যানথ্রোপিকের ‘ক্লড’ (Claude) ১০% দখল করে দ্রুত এগোচ্ছে।
-
পেশাদার বাজারের ক্ষতি: ২০২৩ সালেও বড় বড় কর্পোরেট কোম্পানিগুলোর এআই বাজেটের ৫০% পেত ওপেনএআই। আজ তা কমে দাঁড়িয়েছে ২৭%-এ। আর কোডিং ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে অ্যানথ্রোপিকের ‘ক্লড’ একাই ৫৪% মার্কেট দখল করে নিয়েছে।
বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো যখন অন্য টুলের দিকে ঝুঁকতে শুরু করে, তখন আয়ের মূল উৎসে টান পড়ে।
২. বিজ্ঞাপন আয়ের অবাস্তব স্বপ্ন
ফ্রি ইউজারদের থেকে আয় বাড়াতে ওপেনএআই বিজ্ঞাপনের ওপর বড় বাজি ধরেছিল। তাদের লক্ষ্য ছিল ২০৩০ সালের মধ্যে $১০০ বিলিয়ন ডলার বিজ্ঞাপন থেকে আয় করা।
কিন্তু বাস্তবতা হলো—মানুষ যেভাবে এআই ব্যবহার করে, সেখানে বিজ্ঞাপন দেওয়া খুব কঠিন।
ভেবে দেখুন, আপনি যখন চ্যাটজিপিটিতে কোনো জটিল কোড ঠিক করতে বা একটা চিঠি লিখতে বলছেন, তখন কি আপনি জুতো বা জামাকাপড়ের বিজ্ঞাপন ক্লিক করবেন? গবেষণায় দেখা গেছে, চ্যাটজিপিটিতে মান মানুষের করা প্রম্পটের মাত্র ২% কেনাকাটার সাথে সম্পর্কিত।
ফলে, চ্যাটজিপিটির বিজ্ঞাপনে ক্লিক করার হার (CTR) মাত্র ০.৯১% থেকে ১.৩%—যেখানে গুগল সার্চের ক্ষেত্রে এটি প্রায় ২৯.২%। বাজারের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে পুরো চ্যাটবট বিজ্ঞাপন বাজারই হয়তো $৫.৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে না, যা ওপেনএআই-এর একক লক্ষ্যের তুলনায় বহু গুণ কম।
৩. "ইন্টেলিজেন্স" যখন পানি-বিদ্যুতের মতো সস্তা
এখানেই লুকিয়ে আছে আসল নাটকীয়তা।
২০২৫ সালে স্যাম অল্টম্যান এক প্রবন্ধে লিখেছিলেন—প্রযুক্তি যত উন্নত হবে, এআই-এর বুদ্ধিমত্তার খরচও একদিন বিদ্যুৎ ব্যবহারের খরচের মতো সস্তা হয়ে যাবে।
কথাটি সত্য হলেও, এটি ওপেনএআই-এর জন্যই বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০২৩ সালে ভালো এআই মডেল এবং জিপিইউ (GPU) দুই-ই ছিল দুর্লভ। কিন্তু ২০২৬-এ এসে ওপেন সোর্স মডেলগুলো ওপেনএআই-এর মতো পেইড মডেলগুলোর প্রায় সমকক্ষ হয়ে উঠেছে (পার্থক্য ৮% থেকে কমে এখন ১.৭%-এ নেমে এসেছে)।
ফলাফল? এআই প্রসেসিংয়ের মূল একক "টোকেন"-এর দাম ২০২৩ সালের তুলনায় প্রায় ৯০% কমে গেছে। এআই মডেল এখন বিদ্যুৎ বা ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের মতো সাধারণ পণ্যে পরিণত হচ্ছে—যেখানে এক কোম্পানির সার্ভিসের সাথে অন্য কোম্পানির বিশেষ কোনো পার্থক্য থাকে না, গ্রাহক শুধু কম দাম খোঁজে।
ফলাফলে লাভ তুলে নিচ্ছে চিপ প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলো (যেমন এনভিডিয়া), যাদের ডেটা সেন্টার ব্যবসা থেকে বার্ষিক আয় $৭৫ বিলিয়নের ঘর ছাড়িয়ে গেছে। অন্যদিকে ওপেনএআই আটকে পড়েছে এমন এক জায়গায়, যেখানে লভ্যাংশ কম, কিন্তু ২০৩০ সালের মধ্যে ক্লাউড ও চিপ বাবদ $৭৫০ বিলিয়ন ডলারের চুক্তিভিত্তিক খরচের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
তারা কি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে?
পরিস্থিতি কঠিন হলেও দৌড় এখনো শেষ হয়ে যায়নি। ওপেনএআই-এর হাতে এখনো প্রায় $৭৩ বিলিয়ন ডলারের ক্যাশ রিজার্ভ রয়েছে এবং বড় বড় টেক জায়ান্টদের বিনিয়োগ সাপোর্ট রয়েছে। কোম্পানি আইপিও (IPO) পিছিয়ে দিয়ে নিজেদের ব্যবসায়িক মডেল পুনর্গঠন করার সময় নিচ্ছে।
তারা কি পারবে প্রাতিষ্ঠানিক বাজার আবার নিজেদের দখলে নিতে, নাকি এআই-এর লড়াইয়ে তাদের জায়গা অন্য কেউ ছিনিয়ে নেবে—সেটাই এখন দেখার বিষয়।